মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

 “লংগদু” নামের উৎপত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না। শব্দটির আভিধানিক কোন অর্থ নেই। “লংগদু” নামে ১৮৬১ সালে তৎকালীনব্রিটিশ শাসকগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য থানা গঠন করেন। এ নামে একটি গ্রামও ইউনিয়ন রয়েছে। মূলত: লংগদু থানা গঠন পরবর্তী সময়ে সমগ্র থানায় এ নামে একটি মাত্র ইউনিয়ন ছিল যা পরবর্তীতে বিভাজিত হয়ে বর্তমানে ০৭টি ইউনিয়নে বিভক্ত হয়েছে।

“লংগদু” নামকরনের বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক ধারণা প্রচলিত আছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে চাকমা উপজাতীয়দের আধিক্য থাকলেও একসময়ে ত্রিপুরা ও মারমা সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতো। বর্তমানে মাইনীমূখ এলাকায় মারমা, বগাচত্তর এলাকায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের গুটিকয়েক লোকজন বসবাস করছে। “লংগদু” নামকরনের বিষয়ে মারমাও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দু’টো ব্যাখ্যা রয়েছে।

পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী মারমাদের পূর্বপুরুষগণ মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের (সাবেক আরাকান) অধিবাসী ছিল। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্মী রাজা বোদপায়াআরাকান জয় করেন। সৈন্যরা আরাকান দখল করে আরাকানীদের উপর অত্যাচার শুরু করলে প্রাণরক্ষার্থে তৎকালীন ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধিকৃত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আরাকানীরা উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। একদল আরাকানী মগ পরিবার জনৈক মেচাই এর নেতৃত্ব পালংখাইং নদী অববাহিকা এলাকা হতে কর্নফুলীর নদীর উত্তরে বসতি গড়ে তোলে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মেচাইকে মং রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী আরাকানী মগগণ  নিজেদের নামের সাথে মারমা পদবী গ্রহন করেন।

 

মারমা সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার মিলে গংসা বা দল গঠিত হয়। “গং” অর্থ সর্দ্দার এবং “সা” অর্থ লোক বা সন্তান উভয়ই বুঝায়। “গংসা” অর্থে কোন দলপতির লোক বুঝানো হতো। মারমাদের অনেকগুলো গংসা’র মধ্যে লংকাডু-সাউল্লেখযোগ্য। লংকাডু নামে কোনদলপতি বা সর্দ্দারের নামানুসারে ‘লংকাডু-সা’ নামক গংসা বা দলের উৎপত্তি হয়েছিল মর্মে প্রতীয়মান হয়। ব্যক্তি লংকাডু বা লংকাডু-বা দলের নামানুসারে লংকাডু>লংগাডু>লংগদু নামের উৎপত্তি হয়েছে।

 

“লংগদু” নামকরনের বিষয়ে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ধারণা অধিক প্রচলিত আছে। মধ্যযুগে ত্রিপুরায় একটি শক্তিশালী রাজবংশ ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে ত্রিপুরার রাজাদের সাথে আরাকান রাজ ও বাংলার সুলতানের অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছিল। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মানিক্য (১৫৩২-১৫৬৩) চট্টগ্রাম জয় করে রামু পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন পার্বত্য ত্রিপুরা হতে আরাকান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমানা বরাক নদী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

 

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ত্রিপুরার রিয়াং সম্প্রদায়ের লোকজন পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাংশের মাইনী উপত্যাকায় বসবাস শুরু করে তারা মাইয়ুনী টাল্যাং থেকে এসেছিল বিধায় নদীর নাম মাইনী হয়েছে। ত্রিপুরা ও রিয়াং ভাষায় ‘মাই’ অর্থ ধান এবং ভাত দু’টোই বুঝায়। মাইয়ুনী টালাং শব্দের অর্থ ধান্য এলাকা বা পাহাড়।

 

মাইনী নদী অববাহিকায় বসবাসকারী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দলপতির নাম ছিল লেংদু। সেই দলপতির নামে অত্র এলাকায় একটি খাল রয়েছে। খালটি লংগদুর পশ্চিমে দোলাঝিরি পর্বতমালা হতে উৎপন্ন হয়ে পূর্বে কাসালং নদীতে এসে মিশেছে। ধারণা করা যায় যে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দলপতির নামানুসারে পরবর্তীতে এলাকার নাম লেংদু>লাংগাড়>লংগদু হয়েছে।